বিশ্বজুড়ে খবর, এক ক্লিকেই

March 2, 2026 12:34 pm
March 2, 2026 12:34 pm

নীরবতার আড়ালে আমরা—এক প্রজন্মের নিরাপত্তাহীনতার গল্প

Jannatun Nayem Jannat

বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের জীবনকে বাইরে থেকে দেখলে মনে হয়, তারা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি স্বাধীন, বেশি আত্মবিশ্বাসী এবং বেশি উচ্চাভিলাষী। ক্যাফেতে বসে আড্ডা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঝলমলে ছবি, নতুন নতুন স্টার্টআপ, বিদেশে পড়াশোনার স্বপ্ন—সব মিলিয়ে এই প্রজন্মকে যেনো ‘সুযোগের যুগ’-এর বাচ্চা মনে হয়। কিন্তু কাছ থেকে তাকালে দেখা যায়, এই চকচকে বাস্তবতার ভেতরে লুকিয়ে আছে এমন এক ভয়ের পর্দা, যা আমরা কেউ উচ্চারণ করতে চাই না। সমাজের চাপ, পরিবারের প্রত্যাশা, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বিধিনিষেধ, এবং সবচেয়ে বড়—একটি অদৃশ্য সামাজিক বিচারব্যবস্থার মুখোমুখি প্রতিদিন দাঁড়াতে হয় তরুণদের।

এই লেখাটি সেই নীরব ভয়, সেই অপ্রকাশিত গল্প এবং সেই চাপের কথা বলবে, যা আমাদের এক প্রজন্মকে ধীরে ধীরে ভেতর থেকে ক্ষয় করে দিচ্ছে।

রাত ১১টায় অর্পার ফোনে নোটিফিকেশন আসে—“তুমি ভালোই হও নাই!”। কে বা কারা এই বার্তা পাঠিয়েছে, অর্পা তা জানে না। সে জানে শুধু একটাই ব্যাপার—এ দেশে একজন তরুণী হিসেবে সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজের মতামত দেওয়া মানে নিজেকে অকারণে বিপদের মুখোমুখি দাঁড় করানো। দুই দিন আগে সে লিখেছিল, “একজন মানুষের বিশ্বাস তাকে মানুষ হিসেবে শ্রেষ্ঠ করে না; শ্রেষ্ঠ করে তার আচরণ।” পোস্টটি সাধারণ, কিন্তু প্রতিক্রিয়াগুলো ছিল ভয়ঙ্কর। কেউ লিখেছে সে ‘ধর্মবিদ্বেষী’, কেউ বলেছে ‘নারীবাদী হওয়া মানে নষ্ট হওয়া’, কেউ আবার লিখেছে—“তোকে রাস্তায় দেখলে শিক্ষা দেই।”

অর্পা জানে, এই হুমকিগুলো বাস্তব নাকি ফেসবুকের ‘ফাঁকা বুলি’, সে বিচার করতে পারে না। কিন্তু তার শরীর কেঁপে ওঠে। কারণ ইতিহাস—এই সমাজের অতীত—তাকে শিখিয়েছে, একটি মন্তব্যও কখনো কখনো একজন মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করে দিতে পারে।

বাংলাদেশে এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মতপ্রকাশ স্বাধীনতার প্রধান ক্ষেত্র হয়ে উঠলেও, সেই স্বাধীনতা প্রতিদিনই প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। ধর্মীয় বিশ্বাস, যৌনতা, লিঙ্গ, মানবাধিকার, আইন, রাজনীতি বা যে কোনো সংবেদনশীল প্রসঙ্গে সমালোচনা করলেই যেন স্বয়ংক্রিয়ভাবে কেউ একজন ‘অভিযুক্ত’ হয়ে যায়। তরুণ প্রজন্ম এই আক্রমণের মুখোমুখি সবচেয়ে বেশি। কারণ তারা প্রশ্ন করতে শেখে, যুক্তিতে বিশ্বাস রাখে, এবং অন্যায় দেখলে নীরব না থাকতে চায়।

কিন্তু প্রশ্ন করার অধিকার কি এতটাই বিপজ্জনক?

নিরাপত্তাহীনতার এই অনুভূতি কেবল নারীদের অভিজ্ঞতা নয়। সোহানের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে মনে হয়েছিল, একজন তরুণ পুরুষও কত অদ্ভুত চাপের মধ্যে বেঁচে থাকে। সোহান বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় ধর্মীয় উদারতার বিষয়ে একটি আর্টিকেল লিখেছিল। এতে সে বলেছিল, আমরা জন্মসূত্রে যে ধর্ম পাই, তা কখনো কখনো প্রশ্নের জন্ম দেয়। প্রশ্ন মানেই বিদ্রোহ নয়; কখনো কখনো প্রশ্নই মানুষের ভালো পথ বেছে নেওয়ার শক্তি হতে পারে।

এই লেখার জন্য তার মেসেঞ্জারে আসে শত শত বার্তা—গালাগালি, হুমকি এবং অজানা নম্বর থেকে ফোন। তার রুমমেটরা তাকে বাইরে গেলে দু’জন মিলে যেতে বলেছিল। এমনকি তার পরিবারও তাকে ‘চুপ থাকতে’ বলেছিল—“আজকালকার সময় ভালো না, নিজের নিরাপত্তা আগে দেখ।”

একজন তরুণ যখন যুক্তির কথা বলে, তখন সমাজ তাকে বিপজ্জনক মনে করে। তরুণেরা নতুন মানসিকতা নিয়ে বড় হচ্ছে—ধর্মকে তারা ভালোবাসতে পারে, আবার প্রশ্ন করতেও পারে; মানবাধিকারের কথা বলতে পারে, আবার একই সঙ্গে প্রার্থনা করতে পারে। এই বহুমাত্রিকতা গ্রহণ করতে আমাদের সমাজ হয়তো এখনো প্রস্তুত নয়।

সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ব্যাপার হলো—এই ভয় আর কেবল বাস্তব দুনিয়ায় নেই। ডিজিটাল পৃথিবী এখন বাস্তবের চেয়ে বেশি বিপজ্জনক।

নতুন প্রজন্মের যৌনতা, ভালোবাসা, সম্পর্ক—এই তিনটি শব্দকে আজো পরিবারে উচ্চারণ করা নিষিদ্ধ। অথচ ঠিক এই বয়সেই তারা সবচেয়ে বেশি জানতে চায়, শিখতে চায়, বুঝতে চায়। কিন্তু তথ্যের অভাব, লজ্জা, অপরাধবোধ এবং ধর্মীয় ভুল ব্যাখ্যার কারণে তাদের জীবন হয়ে ওঠে ঝুঁকিপূর্ণ।

মায়ার গল্পটা বলা যায়। মায়া ১৭ বছরের কিশোরী। সে স্কুলে পড়ে, স্বপ্ন দেখে ডাক্তার হওয়ার। কিন্তু নিয়মিত শুনতে হয়—“মেয়েমানুষের এত উচ্চাশা দেখাতে নেই”, “মেয়েদের বেশি পড়ালেখা নষ্ট করে”, “বেশি বন্ধু বানালে চরিত্র খারাপ হয়।” স্কুল থেকে ফিরে সে ইউটিউবে ভিডিও দেখে, যা তাকে অগোছালোভাবে যৌনতা সম্পর্কে শেখায়; কিন্তু কোনো সঠিক তথ্য দেয় না। পরিবার তাকে শেখায় না, স্কুল শেখায় না। ফলে তার ভয় বাড়তে থাকে—এই শরীর কি তার নিজের? সে কি নিজের জীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিতে পারে?

ধর্মের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে মেয়েদের সবচেয়ে বেশি নিয়ন্ত্রণ করা হয়। সমাজের অজ্ঞতা ছেলেদেরও রেহাই দেয় না—অধিকাংশ তরুণ বলে, তারা জানেই না যৌন স্বাস্থ্য, সম্মতি বা নিরাপদ সম্পর্ক বলতে কী বোঝায়। এতে জন্ম নেয় ভুলবোঝাবুঝি, অপরাধবোধ এবং কখনো কখনো সহিংসতা।

এসবের শেকড় ধর্ম নয়—এসবের শেকড় অজ্ঞতা, ভীতি আর ক্ষমতার অপব্যবহার।

ধর্মীয় উগ্রবাদ, যৌন অধিকারের সংকট, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা—এসব বিষয়ের সঙ্গে মানবাধিকার অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত। কিন্তু আমরা মানবাধিকারকে এখনো ‘বিদেশি ধারণা’ বানিয়ে রেখেছি। অথচ মানবাধিকার মানে হলো মানুষের নিরাপদে বাঁচার অধিকার, নিজের শরীর ও বিশ্বাসের ওপর সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার, ভয়মুক্তভাবে ভাবার অধিকার।

এই অধিকার রক্ষা করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের, সমাজের, পরিবারে। কিন্তু বাস্তবে কী ঘটে?

যখন কেউ ধর্মীয় উগ্রবাদের বিরুদ্ধে কথা বলে, তাকে বলা হয় ‘নাস্তিক’।
যখন কেউ নারী অধিকার নিয়ে কথা বলে, তাকে বলা হয় ‘অতিরিক্ত আধুনিক’।
যখন কেউ LGBTQ+ তরুণদের সংকট প্রকাশ করে, তাকে বলা হয় ‘পাশ্চাত্যের দালাল’।
যখন কেউ ধর্ষণ সংস্কৃতি নিয়ে প্রশ্ন তোলে, তাকে বলা হয় ‘সামাজিক শৃঙ্খলা নষ্টকারী’।

আসলে যারা ভয় পায়, তারা চায় না কেউ প্রশ্ন তুলুক। প্রশ্ন তুললেই তাদের ক্ষমতার হিসাব বদলে যায়।

তরুণ প্রজন্মের ভয় এখন ব্যক্তিগত নয়, এটি সামাজিক। সমাজের চাপ তাদের এমন এক জায়গায় নিয়ে গেছে, যেখানে তারা নিজেরাই নিজেদের সেন্সর করতে শুরু করেছে। নিজেদের ফেসবুক পোস্ট দ্বিতীয়বার পড়ে দেখে—“এই কথাটা কি কেউ ভুল বুঝবে?”, “এতে কি সমস্যা হবে?”, “আমার পরিবার কি সমস্যায় পড়বে?”

এই আত্ম-নিয়ন্ত্রণই সবচেয়ে বড় পরাজয়। কারণ যখন মানুষ নিজের কণ্ঠ নিজেই বন্ধ করে দেয়, তখন অত্যাচারীরা আর কোনো পরিশ্রমই করতে হয় না।

আমাদের দেশে তরুণেরা আজো ‘যা বলা উচিত’ আর ‘যা বলা যাবে না’—এ দুইয়ের মাঝের অদৃশ্য রেখায় হাঁটে। তারা চায় ধর্মকে সম্মান করতে, একই সঙ্গে মানবিকতা রক্ষা করতে। কিন্তু সমাজ তাদের বলে—“একটাই পথ বেছে নাও।” এই একমাত্রিকতা তরুণদের মনে দ্বন্দ্ব তৈরি করে। তারা নিজেদের হারিয়ে ফেলে—আমি কে? আমার স্থান কোথায়? আমি কোন বিশ্বাসে দাঁড়িয়ে আছি?

যেখানে তরুণেরা নিজেদের পরিচয় নিয়ে নিশ্চয়তা পায় না, সেখানে মানবাধিকার রক্ষা অসম্ভব।

কিন্তু সব অন্ধকারের মাঝেও একটি আলো আছে। তা হলো—এই প্রজন্ম নীরব হতে জানে না। তারা দমে যায়, কিন্তু হার মানে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘাসে বসে, ক্যাম্পাসের দেয়ালে পোস্টার সেঁটে, ছোট ছোট অনলাইন গ্রুপে আলোচনা করে, তারা নতুন চিন্তা তৈরি করছে।
তারা বলছে—
“ধর্ম মানে ভয় নয়, শান্তি।”
“ভালোবাসা মানে অপরাধ নয়।”
“প্রশ্ন মানে বিদ্রোহ নয়।”
“মানুষ আগে, কোনো পরিচয় পরে।”

এই পরিবর্তন ধীরে ধীরে হলেও ঘটছে। আর এই পরিবর্তনের নেতৃত্ব দিচ্ছে ঠিক সেই তরুণরাই, যাদের কণ্ঠ আজ নীরব করার চেষ্টা চলছে।

সমাজ তাদের ভয় পায়—কারণ তারা সত্য বলার সাহস রাখে।

আজকের বাংলাদেশে মানবাধিকার, ধর্ম, যৌনতা এবং মতপ্রকাশ—এই চারটি বিষয়ের উপর দাঁড়িয়ে আছে এক প্রজন্মের সংগ্রাম। Sadia Sharmin Aysha যেমন বলেন, “অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলা কখনো অপরাধ হতে পারে না।” সত্যিই পারে না। কিন্তু আমরা এমন এক সমাজ তৈরি করেছি, যেখানে অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলা মানে নিজেকে আগুনের ওপর হাঁটতে দেওয়া।

এই আগুনে প্রতিদিনই পুড়ছে হাজারো তরুণ—নীরবে, গল্প না বলেই।

আমাদের উচিত তাদের গল্প শোনা।
তাদের কথাকে গুরুত্ব দেওয়া।
তাদের ভয়গুলোকে বোঝা।
এবং তাদের প্রশ্নগুলোকে সম্মান করা।

কারণ একটি সমাজ কেবল তখনই মানবিক হয়, যখন তার তরুণেরা ভয় ছাড়া প্রশ্ন করতে পারে।

শেষ কথা

আমাদের সমাজের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে সেই তরুণদের হাতে, যারা ধর্মকে ভালোবাসে, আবার মানবাধিকারকেও সমানভাবে সম্মান করে। যারা বিশ্বাস করে—ভালোবাসা, স্বাধীনতা, ন্যায় এবং নিরাপত্তা কারও দয়া নয়; এটি মানুষের জন্মগত অধিকার।

এই প্রজন্মকে ভয় দেখিয়ে থামানো যাবে না। কারণ ইতিহাস বলে—যে কণ্ঠ অন্যায় দেখে চুপ থাকে না, শেষমেষ তারাই পরিবর্তন আনে।

আমাদের শুধু সেই পরিবর্তনের পাশে দাঁড়াতে হবে।

নীরবতার আড়ালে লুকানো ভয়গুলোকে দূরে সরাতে হবে।
আর বলতে হবে—এ দেশ সবার। প্রত্যেকের কণ্ঠের মূল্য আছে।

লিখেছেন—Jannatun Nayem Jannat

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *