আধুনিক বিশ্ব যখন বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, শিক্ষা ও মানবাধিকারের ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব অগ্রগতির কথা বলছে, তখন আফগানিস্তানের নারীরা যেন সময়ের চাকা উল্টো দিকে ঘুরে যাওয়ার এক নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা ও নারী অধিকারকর্মীদের মতে, বর্তমান আফগানিস্তানে নারীদের স্বাধীনতা, নিরাপত্তা এবং মানবিক মর্যাদা এমন এক পর্যায়ে নেমে এসেছে, যা বিশ্বের জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়। এমনকি কেউ কেউ মন্তব্য করেছেন যে, সেখানে পাখিরাও যতটুকু স্বাধীনভাবে বিচরণ করতে পারে, নারীরা ততটুকু স্বাধীনতা ভোগ করতে পারেন না।
আফগানিস্তানে নারীদের ওপর আরোপিত বিধিনিষেধ শুধু তাদের চলাফেরার স্বাধীনতাকেই সীমাবদ্ধ করেনি, বরং তাদের শিক্ষা, কর্মসংস্থান, সামাজিক অংশগ্রহণ এবং আত্মপ্রকাশের অধিকারের ওপরও কঠোর আঘাত হেনেছে। বহু কিশোরী বিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার সুযোগ হারিয়েছে। অসংখ্য নারী চাকরি থেকে বিতাড়িত হয়েছেন বা কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। জনজীবনে নারীদের উপস্থিতি কমিয়ে আনার জন্য একের পর এক নির্দেশনা জারি করা হয়েছে, যার ফলে তারা ক্রমশ সমাজের প্রান্তিক ও নীরব জনগোষ্ঠীতে পরিণত হচ্ছেন।
কোনো সমাজে নারীদের অবস্থান সেই সমাজের সভ্যতা ও মানবিকতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূচক। যখন নারীদের শিক্ষা, মতপ্রকাশ এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়, তখন ক্ষতিগ্রস্ত হয় শুধু নারীরা নয়; ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো সমাজ। কারণ নারীদের বাদ দিয়ে কোনো জাতির উন্নয়ন সম্ভব নয়। একটি দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে ঘরে বন্দি করে রেখে অর্থনৈতিক, সামাজিক কিংবা সাংস্কৃতিক অগ্রগতি অর্জন করা যায় না।
আফগানিস্তানের বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্ববাসীকে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে—একবিংশ শতাব্দীতে এসেও কি নারীদের মৌলিক অধিকার নিয়ে সংগ্রাম করতে হবে? যে পৃথিবীতে নারী রাষ্ট্র পরিচালনা করছেন, মহাকাশে যাচ্ছেন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে নেতৃত্ব দিচ্ছেন, সেই পৃথিবীরই এক প্রান্তে নারীরা এখনও শিক্ষার অধিকার, কর্মসংস্থানের অধিকার এবং স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার অধিকারের জন্য লড়াই করছেন। এটি শুধু একটি দেশের সমস্যা নয়; এটি মানবাধিকারের সার্বজনীন ধারণার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
মানবাধিকার, সমতা ও ন্যায়বিচারের পক্ষে অবস্থান নেওয়া প্রত্যেক মানুষের দায়িত্ব। আফগান নারীদের দুর্দশা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, অর্জিত অধিকার কখনও স্থায়ী নয়; সেগুলো রক্ষা করার জন্য সর্বদা সচেতনতা ও সংগ্রাম প্রয়োজন। বিশ্বের প্রতিটি নারী যেন নিরাপত্তা, মর্যাদা ও স্বাধীনতার সঙ্গে জীবনযাপন করতে পারেন, সেই লক্ষ্যেই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, মানবাধিকার সংগঠন এবং সচেতন নাগরিকদের আরও জোরালো ভূমিকা পালন করতে হবে।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, কোনো অন্যায় বা বৈষম্য চিরস্থায়ী হয় না। স্বাধীনতা ও মানবিক মর্যাদার আকাঙ্ক্ষা মানুষের সহজাত অধিকার। তাই আশা করা যায়, একদিন আফগান নারীরাও তাদের প্রাপ্য অধিকার, সম্মান ও স্বাধীনতা ফিরে পাবেন। আর সেই দিনটি শুধু আফগানিস্তানের নারীদের বিজয় হবে না; সেটি হবে সমগ্র মানবজাতির জন্য ন্যায়বিচার ও মানবাধিকারের এক গুরুত্বপূর্ণ বিজয়।
লিখেছেন- Jannatun Nayem Jannat











