বিশ্বজুড়ে খবর, এক ক্লিকেই

April 24, 2026 6:31 pm
April 24, 2026 6:31 pm

আমরা কি সত্যিই নারীর অধিকার চাই, নাকি শুধু কথায় সমর্থন করি?

Rafia Akther

আমরা সবাই এখন নারীর অধিকারের পক্ষে। অন্তত মুখে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো অন্যায়ের ঘটনা ঘটলে আমরা পোস্ট দিই, প্রতিবাদ করি, ক্ষোভ দেখাই। “নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধ হোক”, “সমতা চাই”—এই স্লোগানগুলো এখন খুব পরিচিত।

কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই সমর্থন কতটা বাস্তব?
আমরা কি সত্যিই নারীর অধিকার চাই, নাকি শুধু তার ধারণাটিকে সমর্থন করি?

এই প্রশ্নটি অস্বস্তিকর। কারণ এটি বাইরে নয়, আমাদের ভেতরের দিকে তাকাতে বাধ্য করে।

আমাদের সমাজে একটি অদ্ভুত দ্বৈততা কাজ করে।

আমরা চাই নারীরা পড়াশোনা করুক, এগিয়ে যাক—কিন্তু “সীমার মধ্যে।”
আমরা চাই তারা কাজ করুক—কিন্তু “সংসার আগে।”
আমরা চাই তারা মতামত দিক—কিন্তু “বেশি না।”

অর্থাৎ, আমরা নারীর অধিকার চাই, তবে সেটি নিয়ন্ত্রিত আকারে।

এই নিয়ন্ত্রিত সমর্থনই সবচেয়ে বড় সমস্যা। কারণ এটি দেখতে প্রগতিশীল, কিন্তু ভেতরে ভেতরে একই পুরনো কাঠামোকে টিকিয়ে রাখে।

একটি সহজ উদাহরণ নেওয়া যাক।

ধরুন, একটি মেয়ে উচ্চশিক্ষা নিতে চায়। পরিবার তাকে সমর্থন করে। সবাই বলে—“আমাদের মেয়ে খুব আধুনিক।”

কিন্তু যখন সে নিজের পছন্দের মানুষকে বিয়ে করতে চায়, তখন সেই একই পরিবার বলে—“এভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক না।”

এখানে সমস্যা কোথায়?

সমস্যা হলো—সমর্থনটি ছিল শর্তসাপেক্ষ। যতক্ষণ পর্যন্ত মেয়েটি নির্ধারিত সীমার মধ্যে ছিল, ততক্ষণ পর্যন্ত সে গ্রহণযোগ্য। সীমা অতিক্রম করলেই সে “সমস্যা।”

আমরা প্রায়ই বলি—সমাজ নারীদের স্বাধীনতা দেয় না।

কিন্তু সমাজ তো কোনো আলাদা সত্তা নয়।
সমাজ আমরা—আপনি, আমি, আমাদের পরিবার, আমাদের সিদ্ধান্ত, আমাদের নীরবতা।

তাহলে প্রশ্নটা ঘুরে আসে—
আমরা কি সত্যিই নারীর স্বাধীনতা মেনে নিতে প্রস্তুত?

অনেক সময় আমরা অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলি, কিন্তু নিজের জীবনে সেই একই অন্যায়কে চালু রাখি।

একজন মানুষ অনলাইনে নারী অধিকারের পক্ষে লেখে, কিন্তু নিজের বোন বা মেয়ের সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে রক্ষণশীল হয়ে যায়।

কেউ কর্মক্ষেত্রে নারীর সমতার কথা বলে, কিন্তু বাড়িতে এসে স্ত্রীর কাজকে “স্বাভাবিক দায়িত্ব” হিসেবে ধরে নেয়।

এই দ্বৈততা শুধু ভণ্ডামি নয়—এটি একটি গভীর সামাজিক অসঙ্গতি।

আমাদের আরেকটি বড় সমস্যা হলো—আমরা নারীর অধিকারকে “অনুমতি” হিসেবে দেখি।

আমরা বলি—
“আমি তাকে পড়তে দিয়েছি।”
“আমি তাকে কাজ করতে দিয়েছি।”

এই “দিয়েছি” শব্দটাই প্রমাণ করে—আমরা এখনো নিজেদেরকে ক্ষমতার জায়গায় বসিয়ে রেখেছি।

অধিকার কখনো দেওয়া হয় না।
অধিকার স্বাভাবিকভাবে থাকে।

কিন্তু আমরা সেটিকে এমনভাবে দেখি, যেন এটি আমাদের দান।

ধর্মের ক্ষেত্রেও একই বিষয় দেখা যায়।

আমরা ধর্মকে এমনভাবে ব্যাখ্যা করি, যাতে সেটি আমাদের সামাজিক স্বস্তির সঙ্গে মিলে যায়।
যেখানে নারীর স্বাধীনতা আমাদের অস্বস্তি দেয়, সেখানে আমরা ধর্মীয় যুক্তি খুঁজে পাই।
আর যেখানে সুবিধা হয়, সেখানে আমরা নীরব থাকি।

অর্থাৎ, আমরা ধর্মকে অনুসরণ করি না—আমরা ধর্মকে ব্যবহার করি।

নারীর অধিকার নিয়ে কথা বলা সহজ।
বাস্তবে তা মেনে নেওয়া কঠিন।

কারণ এটি শুধু নারীর অবস্থান বদলায় না; এটি পুরুষের অবস্থানও বদলায়।
এটি সম্পর্কের ক্ষমতার ভারসাম্য বদলায়।
এটি পরিবারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পদ্ধতি বদলায়।

এই পরিবর্তনই অনেকের কাছে ভয়ঙ্কর মনে হয়।

আমরা প্রায়ই মনে করি—নারীর অধিকার মানে পুরুষের ক্ষতি।

এই ধারণাটি ভুল।

সমতা মানে কারও অধিকার কমে যাওয়া নয়; বরং সবার অধিকার সমান হওয়া।
কিন্তু আমরা যেহেতু অসমতার মধ্যে বড় হয়েছি, তাই সমতাকে আমাদের কাছে অস্বস্তিকর লাগে।

আমাদের নিজেদের মধ্যেও একটি অদৃশ্য প্রতিরোধ কাজ করে।

যখন আমরা দেখি একজন নারী নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিচ্ছে, তখন আমাদের ভেতরে প্রশ্ন জাগে—
“এটা কি ঠিক?”
“এভাবে চলা যায়?”

এই প্রশ্নগুলো আমাদের শেখানো মানসিকতার অংশ।

কিন্তু এই মানসিকতাকে প্রশ্ন না করলে পরিবর্তন সম্ভব নয়।

আমরা যদি সত্যিই নারীর অধিকার চাই, তাহলে আমাদের কিছু কঠিন কাজ করতে হবে।

প্রথমত, নিজেদের ভেতরের দ্বৈততাকে স্বীকার করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, পরিবারে বাস্তব পরিবর্তন আনতে হবে—শুধু কথায় নয়, কাজে।
তৃতীয়ত, নারীর সিদ্ধান্তকে সম্মান করতে শিখতে হবে—even when we disagree।

সবচেয়ে বড় কথা—আমাদের বুঝতে হবে, সমর্থন মানে শুধু প্রশংসা নয়; সমর্থন মানে জায়গা দেওয়া।

আমরা প্রায়ই ভাবি—পরিবর্তন বাইরে থেকে আসবে।

কিন্তু সত্য হলো—পরিবর্তন শুরু হয় খুব ছোট জায়গা থেকে।
একটি সিদ্ধান্ত, একটি সমর্থন, একটি “না” বলার অধিকার—এই ছোট ছোট বিষয়গুলোই বড় পরিবর্তনের ভিত্তি তৈরি করে।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি খুব সরল হয়ে দাঁড়ায়—

আমরা কি সত্যিই নারীর অধিকার চাই?
নাকি আমরা এমন একটি সংস্করণ চাই, যেখানে নারী স্বাধীন, কিন্তু আমাদের শর্তে?

এই প্রশ্নের উত্তর সহজ নয়।
কিন্তু সৎ উত্তরটি জানা জরুরি।

কারণ,
যতদিন আমরা নিজেদের ভেতরের এই দ্বৈততা ভাঙতে পারব না—
ততদিন নারীর অধিকার শুধু স্লোগান হয়েই থাকবে।

বাস্তবতা হবে না।

লিখেছেন-

রাফিয়া আখতার

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *