বিশ্বজুড়ে খবর, এক ক্লিকেই

March 2, 2026 10:58 am
March 2, 2026 10:58 am

ডিসকর্ড প্ল্যাটফর্মে ভোটাভুটির মধ্য দিয়ে নেপালের অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী সুশীলা কারকি

নেপালের ইতিহাসে প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিলেন সুপ্রিম কোর্টের সাবেক প্রধান বিচারপতি সুশীলা কারকি। রোববার থেকে তাঁর দায়িত্ব গ্রহণের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক সংকটে থাকা দেশটির অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসন নতুন নেতৃত্ব পেল। তবে তাঁর ক্ষমতায় আসার পদ্ধতিটি প্রচলিত রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। কারণ, তাঁকে বেছে নেওয়া হয়েছে অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ডিসকর্ড-এ আয়োজিত ভোটাভুটির মাধ্যমে।

সড়কে বিক্ষোভ থেকে অনলাইনে প্রক্রিয়া

গত সপ্তাহে ছাত্র-জনতাসহ সাধারণ মানুষ দুর্নীতি ও শাসনব্যবস্থার অচলাবস্থার বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমে তীব্র আন্দোলন শুরু করে। এর মুখেই পদত্যাগ করতে বাধ্য হন সাবেক প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা অলি। অলি সরে দাঁড়ানোর পর নেপালে এক ধরনের প্রশাসনিক শূন্যতা তৈরি হয়।

প্রথমে কাঠমান্ডুর জনপ্রিয় মেয়র বালেন্দ্র শাহ (বালেন)-কে প্রধানমন্ত্রী করার প্রচারণা চলে তরুণদের একাংশে। তবে অনলাইন আলোচনায় এবং কয়েক দফা প্রতীকী ভোটাভুটির পর অবশেষে সর্বসম্মত সমর্থন পান সুশীলা কারকি।

কীভাবে হলো ‘ডিসকর্ড পার্লামেন্ট’

ব্রিটিশ গণমাধ্যম দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট, ভারতের এনডিটিভি ও নিউ ইয়র্ক টাইমস–এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান কে হবেন তা নিয়ে আলোচনা চলে ডিসকর্ড প্ল্যাটফর্মে তৈরি একটি বড় গ্রুপে। তরুণদের নেতৃত্বাধীন ‘হামি নেপাল’ নামের নাগরিক সংগঠন পুরো উদ্যোগটি সমন্বয় করে।

  • গ্রুপটির সদস্য সংখ্যা ছিল প্রায় ১ লাখ ৪৫ হাজার
  • বেশিরভাগ সদস্যই নেপালের সাম্প্রতিক বিক্ষোভে সরাসরি অংশ নিয়েছিলেন।
  • ডিসকর্ডে একাধিক পর্যায়ে ভোটাভুটি হয়, যেখানে কারকি সর্বাধিক সমর্থন পান

এই গ্রুপের তরুণ সদস্য সিদ্ধ ঘিমিরে (২৩) মন্তব্য করেন—

“ডিসকর্ড যেন আমাদের কাছে পার্লামেন্টে পরিণত হয়েছিল। সেখানেই প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনের বিতর্ক ও সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে।”

সুশীলা কারকির ভাবমূর্তি ও পটভূমি

সুশীলা কারকি দুর্নীতির বিরুদ্ধে আপসহীন মনোভাবের কারণে নেপালের জনগণের কাছে দীর্ঘদিন ধরেই সমাদৃত। সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি হিসেবে তিনি ছিলেন সাহসী রায়দানের জন্য পরিচিত।

  • তাঁর দেওয়া সবচেয়ে আলোচিত রায়ের একটি ছিল তৎকালীন তথ্য ও যোগাযোগমন্ত্রী জয় প্রকাশ প্রসাদ গুপ্তাকে দুর্নীতির দায়ে দোষী সাব্যস্ত করা
  • এই পদক্ষেপ দেশজুড়ে তাকে দুর্নীতি বিরোধী কণ্ঠস্বরের প্রতীকে রূপ দেয়।

ব্যক্তিজীবনেও কারকি রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় ছিলেন। নব্বইয়ের দশকে স্বামী দুর্গা প্রসাদ সুবেদি-সহকারে তিনি রাজতন্ত্র বিরোধী আন্দোলনে অংশ নেন।

  • সুবেদি সে সময় নেপালি কংগ্রেসের তরুণ নেতা ছিলেন।
  • অভিযোগ রয়েছে, আন্দোলনের অর্থ সংগ্রহে সহায়তা করতে গিয়ে তিনি এক পর্যায়ে রয়্যাল নেপাল এয়ারলাইনসের একটি উড়োজাহাজ ছিনতাই করেছিলেন এবং এ ঘটনায় কয়েক বছর জেলও খাটেন।

প্রতীকী না বাস্তব পরিবর্তন?

বিশ্লেষকদের মতে, সুশীলা কারকিকে প্রধানমন্ত্রী বেছে নেওয়ার প্রক্রিয়াটি বিশ্ব রাজনীতিতে এক নজিরবিহীন ঘটনা, কারণ এখানে প্রচলিত রাজনৈতিক প্রক্রিয়া নয় বরং নাগরিক আন্দোলন ও প্রযুক্তিচালিত অনলাইন প্ল্যাটফর্ম চূড়ান্ত ভূমিকা রেখেছে।

তবে প্রশ্ন রয়ে গেছে—এই প্রক্রিয়া কতটা প্রতিষ্ঠানগতভাবে বৈধ? ডিসকর্ড-ভিত্তিক এই ভোটাভুটি মূলত আন্দোলনকারী জনতার কণ্ঠস্বর প্রতিফলিত করলেও সাংবিধানিক দিক থেকে এটি অস্পষ্ট। তা সত্ত্বেও তরুণ প্রজন্মের কাছে এটি জনমতের একটি শক্তিশালী বার্তা।

নেপালের অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সুশীলা কারকির দায়িত্ব গ্রহণ দেশটির রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় রচনা করল। দুর্নীতি বিরোধী অবস্থান ও বিচার বিভাগের অভিজ্ঞতার কারণে জনগণের আস্থা তিনি অর্জন করেছেন। তবে তাঁর নিয়োগ প্রক্রিয়া যে সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী এবং প্রযুক্তি–ভিত্তিক আন্দোলনের ফল, সেটি বিশ্ব রাজনীতির জন্যও নতুন এক নজির হয়ে থাকবে।

এখন দেখার বিষয়—ডিসকর্ড প্ল্যাটফর্মে নির্বাচিত এই ‘জনপ্রিয় প্রধানমন্ত্রী’ কতটা কার্যকরভাবে সংকটে থাকা নেপালের জনআস্থা পুনরুদ্ধার করতে পারেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *